ভারত থেকে ভ্রমণ বা চিকিৎসার জন্য প্রতিবছর অসংখ্য বাংলাদেশি ভারত সফর করেন। আপনি যদি ২০২৬ সালে ভারত ভ্রমণের পরিকল্পনা করেন, তবে ইন্ডিয়ান টুরিস্ট ভিসা সম্পর্কে সঠিক তথ্য জানা আপনার জন্য জরুরি।
আজকের এই ব্লগে আমরা ইন্ডিয়ান টুরিস্ট ভিসা আবেদন প্রক্রিয়া, প্রয়োজনীয় কাগজপত্র এবং সর্বশেষ আপডেট নিয়ে বিস্তারিত আলোচনা করব।
ইন্ডিয়ান টুরিস্ট ভিসা আবেদন করার নিয়ম
ইন্ডিয়ান টুরিস্ট ভিসা আবেদনের প্রক্রিয়া এখন অনেক সহজ ও ডিজিটাল। বর্তমানে আবেদন করার জন্য আপনাকে প্রথমে অনলাইনে ফরম পূরণ করতে হয়। আবেদন ফরমটি সাবধানে পূরণ করা উচিত কারণ সামান্য ভুল আপনার ভিসা বাতিলের কারণ হতে পারে। অনলাইনে আবেদন শেষে ফরমটি প্রিন্ট করে নির্ধারিত তারিখে আইভ্যাক (IVAC) সেন্টারে জমা দিতে হয়।
২০২৬ সালের নতুন নিয়ম অনুযায়ী, আবেদনের সময় সঠিক পেশার প্রমাণপত্র এবং বর্তমান ঠিকানার বিদ্যুৎ বিল বা পানির বিলের কপি থাকা বাধ্যতামূলক। আবেদনের ক্ষেত্রে কোনো দালালের সাহায্য না নিয়ে নিজেই অনলাইন পোর্টালে গিয়ে সঠিক তথ্য প্রদান করাই বুদ্ধিমানের কাজ।

ইন্ডিয়ান টুরিস্ট ভিসা করতে কি কি লাগে?
একটি সফল ইন্ডিয়ান টুরিস্ট ভিসা পেতে হলে আপনাকে নির্দিষ্ট কিছু কাগজপত্র গুছিয়ে রাখতে হবে। নিচে প্রয়োজনীয় ডকুমেন্টের তালিকা দেওয়া হলো:
-
পাসপোর্ট: ন্যূনতম ৬ মাস মেয়াদ আছে এমন অরিজিনাল পাসপোর্ট।
-
ছবি: সাদা ব্যাকগ্রাউন্ডে ২x২ ইঞ্চি সাইজের রঙিন ল্যাব প্রিন্ট ছবি (৩ মাসের বেশি পুরনো নয়)।
-
আর্থিক সচ্ছলতা: গত ৬ মাসের ব্যাংক স্টেটমেন্ট (ন্যূনতম ব্যালেন্স ২০-৩০ হাজার টাকা) অথবা ১৫০ ডলার এন্ডোর্সমেন্ট।
-
পেশার প্রমাণ: চাকরিজীবীদের জন্য NOC, ব্যবসায়ীদের জন্য ট্রেড লাইসেন্সের কপি এবং শিক্ষার্থীদের জন্য আইডি কার্ড।
-
ঠিকানার প্রমাণ: বর্তমান ঠিকানার ইউটিলিটি বিলের (বিদ্যুৎ, গ্যাস বা পানি) কপি।
-
জাতীয় পরিচয়পত্র: এনআইডি কার্ড বা জন্ম নিবন্ধনের অনলাইন কপি।
আরো পড়ুন: ভুটান টুরিস্ট ভিসা আবেদন ও খরচ 2026
ইন্ডিয়ান ভিসা চেক অনলাইন বাংলাদেশ
আবেদন জমা দেওয়ার পর আপনার ভিসার বর্তমান অবস্থা কী তা জানতে আপনাকে আইভ্যাকের অফিসিয়াল ওয়েবসাইট বা পাস্ট্র্যাক (PassTrack) পোর্টালে যেতে হবে।
সেখানে আপনার অ্যাপ্লিকেশন আইডি এবং পাসপোর্টের নম্বর দিলে আপনি দেখতে পারবেন আপনার পাসপোর্টটি এখন কোন অবস্থায় আছে। আপনার ভিসা কি অনুমোদিত হয়েছে নাকি প্রক্রিয়াধীন আছে, তা এই অনলাইন চেকআপের মাধ্যমেই মুহূর্তের মধ্যে জানা সম্ভব।
ইন্ডিয়ান টুরিস্ট ভিসা কবে চালু হবে
অনেকেই প্রশ্ন করেন ইন্ডিয়ান টুরিস্ট ভিসা কবে চালু হবে। সাম্প্রতিক সময়ের রাজনৈতিক পরিবর্তনের পর ভিসা সার্ভিস কিছুটা ধীরগতিতে চললেও, ২০২৬ সালের শুরু থেকেই পর্যটন ভিসা পুরোদমে চালু করা হয়েছে।
বর্তমানে ঢাকা, চট্টগ্রামসহ সারা বাংলাদেশের সকল আইভ্যাক সেন্টারে টুরিস্ট ভিসার আবেদন গ্রহণ করা হচ্ছে। তাই আপনি চাইলে এখনই আপনার ভ্রমণের পরিকল্পনা করতে পারেন।
ইন্ডিয়ান টুরিস্ট ভিসা খরচ
ভিসা আবেদনের জন্য সরকারিভাবে সরাসরি কোনো ফি নেই, তবে আপনাকে আইভ্যাকের সার্ভিস চার্জ প্রদান করতে হয়। ইন্ডিয়ান টুরিস্ট ভিসা খরচ বর্তমানে ৮২৪ টাকা (ভ্যাটসহ)।
এই টাকাটি আপনি বিকাশ, রকেট বা ডেবিট/ক্রেডিট কার্ডের মাধ্যমে অনলাইনে জমা দিতে পারেন। মনে রাখবেন, এর বাইরে অতিরিক্ত কোনো টাকা কাউকে দেওয়ার প্রয়োজন নেই।
আরো পড়ুন: নেপাল টুরিস্ট ভিসা আবেদন ও সকল আপডেট 2026
ইন্ডিয়ান টুরিস্ট ভিসার মেয়াদ
সাধারণত পর্যটন বা ভ্রমণের জন্য ১ বছর বা তার বেশি মেয়াদের মাল্টিপল এন্ট্রি ভিসা প্রদান করা হয়। তবে ইন্ডিয়ান টুরিস্ট ভিসার মেয়াদ সম্পূর্ণ নির্ভর করে ভারতীয় হাই কমিশনের সিদ্ধান্তের ওপর।
মাল্টিপল এন্ট্রি ভিসা থাকলেও একনাগাড়ে ৯০ দিনের বেশি ভারতে অবস্থান করা যায় না। ৯০ দিন পার হওয়ার আগে আপনাকে একবার বাংলাদেশে ফিরে আসতে হবে।
ইন্ডিয়ান টুরিস্ট ভিসা পেতে কতদিন লাগে
আবেদন জমা দেওয়ার পর পাসপোর্ট হাতে পেতে কত সময় লাগবে তা নির্ভর করে আবেদনের চাপের ওপর। সাধারণত ইন্ডিয়ান টুরিস্ট ভিসা পেতে ৭ থেকে ১৫ কার্যদিবস সময় লাগে।
তবে ছুটির দিন বা বিশেষ কোনো পরিস্থিতির কারণে এই সময় কিছুটা বাড়তে পারে। তাই ভ্রমণের অন্তত এক মাস আগেই ভিসার জন্য আবেদন করা নিরাপদ।
আরো পড়ুন: মালদ্বীপ টুরিস্ট ভিসা খরচ কত? আবেদন করার নিয়ম 2026
আইভ্যাক (IVAC) সেন্টারগুলোর তালিকা
বাংলাদেশে ভারতীয় ভিসা আবেদন প্রক্রিয়াকে সাধারণ মানুষের দোরগোড়ায় পৌঁছে দিতে বর্তমানে সারা দেশে মোট ১৬টি ইন্ডিয়ান ভিসা অ্যাপ্লিকেশন সেন্টার (IVAC) কার্যক্রম পরিচালনা করছে।
আপনি যদি ইন্ডিয়ান টুরিস্ট ভিসা আবেদনের কথা ভাবেন, তবে আপনার বর্তমান ঠিকানার নিকটস্থ সেন্টারে গিয়ে আবেদন জমা দিতে পারেন। বর্তমানে যমুনা ফিউচার পার্কে অবস্থিত ঢাকা আইভ্যাক সেন্টারটি বিশ্বের বৃহত্তম ভিসা আবেদন কেন্দ্র হিসেবে পরিচিত।
নিচে বাংলাদেশের প্রধান প্রধান আইভ্যাক সেন্টারগুলোর তালিকা দেওয়া হলো:
-
ঢাকা (প্রধান কেন্দ্র): যমুনা ফিউচার পার্ক, কুড়িল, ঢাকা।
-
বিভাগীয় শহর: চট্টগ্রাম, রাজশাহী, সিলেট, খুলনা, বরিশাল, রংপুর এবং ময়মনসিংহ।
-
জেলা শহর: যশোর, সাতক্ষীরা, বগুড়া, নোয়াখালী, কুমিল্লা, ব্রাহ্মণবাড়িয়া, কুষ্টিয়া এবং ঠাকুরগাঁও।
ইন্ডিয়ান টুরিস্ট ভিসা আবেদন করার সময় আপনার ইউটিলিটি বিলের ঠিকানার ওপর ভিত্তি করে নিকটস্থ সেন্টারটি নির্বাচন করা বুদ্ধিমানের কাজ। প্রতিটি সেন্টারের কর্মঘণ্টা সাধারণত সকাল ৯টা থেকে বিকেল ৫টা পর্যন্ত হয়ে থাকে, তবে আবেদন জমা নেওয়ার সময় নির্দিষ্ট থাকে।
ইন্ডিয়ান ভিসা রিজেক্ট হওয়ার কারণ
১. ব্যাংক স্টেটমেন্টে সমস্যা: অ্যাকাউন্ট ব্যালেন্সে পর্যাপ্ত টাকা না থাকা কিংবা হঠাৎ করে বড় কোনো অ্যামাউন্ট জমা হওয়া।
২. ভুল বা অসম্পূর্ণ তথ্য: ভিসা ফর্মে নামের বানান, পাসপোর্টের তথ্য বা পেশার বিবরণে কোনো ধরনের ভুল করা বা কোনো ঘর খালি রাখা।
৩. ডকুমেন্টসের ঘাটতি: প্রয়োজনীয় কাগজপত্র সঠিক ও স্পষ্ট না দেওয়া।
৪. আগের ভিসার নিয়ম লঙ্ঘন: অতীতে ভারত গিয়ে ভিসার মেয়াদ শেষ হওয়ার পর থাকা (Overstay) বা ট্যুরিস্ট ভিসা নিয়ে ব্যবসা/চিকিৎসার মতো অন্য কাজ করা।
৫. ভ্রমণের উদ্দেশ্য অস্পষ্ট: আপনি কেন যাচ্ছেন, কোথায় থাকবেন (হোটেল বুকিং বা স্পন্সরের তথ্য) এবং ভ্রমণ শেষে দেশে ফিরে আসবেন কি না, এ বিষয়ে কনস্যুলেটের সন্দেহ থাকা।
আরো পড়ুন: সুইজারল্যান্ড টুরিস্ট ভিসা আবেদন করার নিয়ম 2026
কিছু গুরুত্বপূর্ণ টিপস:
১. আবেদন ফরমে বর্তমান ঠিকানা এবং বিদ্যুৎ বিলের ঠিকানা হুবহু এক রাখুন।
২. পাসপোর্টে কোনো ভুল থাকলে আগেই সংশোধন করে নিন।
৩. ব্যাংক স্টেটমেন্টে যেন ব্যাংকের সিল এবং স্বাক্ষর স্পষ্টভাবে থাকে।
সঠিক নিয়ম মেনে এবং সঠিক তথ্য দিয়ে আবেদন করলে ইন্ডিয়ান টুরিস্ট ভিসা পাওয়া খুব একটা কঠিন কাজ নয়। ২০২৬ সালের আপডেট অনুযায়ী আপনার নথিপত্রগুলো প্রস্তুত রাখুন এবং সুন্দরভাবে ভারত ভ্রমণ করুন।
ইন্ডিয়ান টুরিস্ট ভিসা সম্পর্কিত সাধারণ জিজ্ঞাসা (FAQ)
ইন্ডিয়ান ভিসা নিয়ে অনেকের মনেই নানা প্রশ্ন থাকে। এখানে ২০২৬ সালের আপডেট অনুযায়ী সবচেয়ে বেশি জিজ্ঞাসিত ৫টি প্রশ্নের উত্তর দেওয়া হলো:
১. ইন্ডিয়ান টুরিস্ট ভিসা আবেদন কি এখন অনলাইনে করা বাধ্যতামূলক?
হ্যাঁ, বর্তমানে ইন্ডিয়ান টুরিস্ট ভিসা আবেদনের পুরো প্রক্রিয়াটি ডিজিটাল। আপনাকে প্রথমে অনলাইনে আবেদন ফরম পূরণ করতে হবে এবং নির্ধারিত ভিসা প্রসেসিং ফি (আইভ্যাক ফি) অনলাইনে জমা দিতে হবে।
এরপর প্রিন্ট করা ফরম এবং প্রয়োজনীয় কাগজপত্র নিয়ে নিকটস্থ আইভ্যাক সেন্টারে উপস্থিত হতে হবে। সরাসরি কাগজের ফরমে আবেদনের কোনো সুযোগ এখন আর নেই।
২. ইন্ডিয়ান টুরিস্ট ভিসা করতে কি কি লাগে যদি আমি বেকার বা ফ্রিল্যান্সার হই?
আপনি যদি কোনো নির্দিষ্ট প্রতিষ্ঠানে চাকরি না করেন, তবে আপনাকে বিকল্প পেশার প্রমাণ দিতে হবে। ফ্রিল্যান্সারদের ক্ষেত্রে তাদের আয়ের সোর্স বা মার্কেটপ্লেসের প্রোফাইলের প্রমাণ এবং পর্যাপ্ত ব্যালেন্সসহ ব্যাংক স্টেটমেন্ট দিতে হবে।
আর যদি আপনি ব্যক্তিগত কোনো কাজ করেন, তবে স্থানীয় কাউন্সিলর বা মেয়রের দেওয়া পেশার প্রত্যয়নপত্র জমা দেওয়া প্রয়োজন। মনে রাখবেন, ইন্ডিয়ান টুরিস্ট ভিসা পাওয়ার ক্ষেত্রে আর্থিক সচ্ছলতার প্রমাণ খুবই গুরুত্বপূর্ণ।
৩. ইন্ডিয়ান ভিসা চেক অনলাইন বাংলাদেশ থেকে করার সহজ উপায় কী?
ইন্ডিয়ান ভিসা চেক অনলাইন বাংলাদেশ থেকে করা এখন খুবই সহজ। আপনি যখন আবেদন জমা দেবেন, তখন আপনাকে একটি রিসিট দেওয়া হবে।
সেই রিসিটে থাকা অ্যাপ্লিকেশন আইডি এবং আপনার পাসপোর্টের নম্বর দিয়ে আইভ্যাক (IVAC) এর পোর্টালে গিয়ে লগইন করলেই আপনি আপনার ভিসার স্ট্যাটাস দেখতে পারবেন। এটি আপনাকে ভিসা হয়ে গেছে কি না বা পাসপোর্ট রিজেক্ট হয়েছে কি না, তা সহজেই জানিয়ে দেবে।
৪. ইন্ডিয়ান টুরিস্ট ভিসা কবে চালু হবে এবং বর্তমানে কি সবাই আবেদন করতে পারে?
২০২৬ সালের বর্তমান আপডেট অনুযায়ী, টুরিস্ট ভিসা এখন সম্পূর্ণ সচল এবং চালু রয়েছে। বর্তমানে বাংলাদেশি পর্যটকদের জন্য কোনো বিশেষ নিষেধাজ্ঞা নেই।
তবে ভিসা অনুমোদনের বিষয়টি সম্পূর্ণভাবে ভারতীয় হাই কমিশনের ওপর নির্ভর করে। আপনার নথিপত্র এবং আবেদন নির্ভুল হলে সহজেই ভিসা পেয়ে যাবেন।
আরো পড়ুন: থাইল্যান্ড টুরিস্ট ভিসা আবেদন সম্পর্কে সকল তথ্য 2026