নীল সমুদ্রের পাড়ে সাদা বালির সৈকত আর বিলাসবহুল রিসোর্ট। ছুটির দিনে ভ্রমণের জন্য মালদ্বীপ অন্যতম সেরা পছন্দ। বাংলাদেশিদের জন্য মালদ্বীপ ভ্রমণ এখন আগের চেয়ে অনেক সহজ। ২০২৬ সালে দাঁড়িয়ে মালদ্বীপ ভ্রমণের পরিকল্পনা করার আগে আপনাকে ভিসার নিয়মগুলো ঠিকঠাক জেনে নিতে হবে।
এই আর্টিকেলে আমরা ২০২৬ সালের আপডেটেড নিয়ম অনুযায়ী মালদ্বীপ টুরিস্ট ভিসা সম্পর্কে সহজ ভাষায় আলোচনা করব।
মালদ্বীপ টুরিস্ট ভিসা আবেদন করার নিয়ম
বাংলাদেশি নাগরিকদের জন্য মালদ্বীপ ভ্রমণের সবচেয়ে বড় সুবিধা হলো ভিসা পাওয়ার সহজ উপায়। বাংলাদেশি পর্যটকদের আগে থেকে কোনো এমবাসি বা দূতাবাসে গিয়ে পাসপোর্টে ভিসা স্ট্যাম্প করাতে হয় না।
আপনি মালদ্বীপে পৌঁছানোর পর সরাসরি এয়ারপোর্টে অন অ্যারাইভাল ভিসা (On-Arrival Visa) পাবেন।
মালদ্বীপে পৌঁছানোর পর আপনাকে ইমিগ্রেশন কাউন্টারে প্রয়োজনীয় কাগজপত্র দেখাতে হবে। সব কাগজপত্র ঠিক থাকলে ইমিগ্রেশন কর্মকর্তা আপনার পাসপোর্টে অন অ্যারাইভাল এন্ট্রি সিল দিয়ে দেবেন। এটিই মূলত আপনার মালদ্বীপ টুরিস্ট ভিসা।
তাই বাংলাদেশ থেকে রওনা দেওয়ার আগে কোনো ভিসা ফি বা দীর্ঘ প্রক্রিয়ার ঝামেলা নেই। তবে ভ্রমণের আগে আপনাকে অবশ্যই কিছু জরুরি প্রস্তুতি নিতে হবে। তাদের অফিশিয়াল ওয়েবসাইটে বিস্তারিত তথ্য পাবেন মালদ্বীপ টুরিস্ট ভিসা নিয়ে।
মালদ্বীপ টুরিস্ট ভিসা করতে কি কি লাগে?
মালদ্বীপে পৌঁছানোর পর অন অ্যারাইভাল ভিসা পেতে আপনাকে ইমিগ্রেশন কাউন্টারে কিছু নির্দিষ্ট নথিপত্র দেখাতে হবে। এই কাগজগুলো ঠিক না থাকলে আপনাকে এয়ারপোর্ট থেকে ফিরিয়ে দেওয়া হতে পারে। নিচে প্রয়োজনীয় জিনিসপত্রের তালিকা দেওয়া হলো:
১. পাসপোর্ট: আপনার পাসপোর্টের মেয়াদ মালদ্বীপে পৌঁছানোর দিন থেকে কমপক্ষে ৬ মাস থাকতে হবে।
২. রিটার্ন এয়ার টিকিট: বাংলাদেশ থেকে যাওয়ার টিকিটের পাশাপাশি মালদ্বীপ থেকে ফিরে আসার নিশ্চিত টিকিট দেখাতে হবে।
৩. হোটেল বুকিং: মালদ্বীপে আপনি যত দিন থাকবেন, তত দিনের নিশ্চিত হোটেল বা রিসোর্ট বুকিংয়ের কাগজ সঙ্গে রাখতে হবে।
আরো পড়ুন: ভুটান টুরিস্ট ভিসা আবেদন ও খরচ 2026
৪. আর্থিক সক্ষমতার প্রমাণ: আপনার ভ্রমণের খরচ চালানোর মতো পর্যাপ্ত ডলার থাকতে হবে। সাধারণত প্রতিদিনের খরচের জন্য অন্তত ৫০ থেকে ১০০ ইউএস ডলার নগদ বা ইন্টারন্যাশনাল ক্রেডিট কার্ডে এন্ডোর্সমেন্ট থাকতে হবে।
৫. ইমুগা (IMUGA) ফর্ম: মালদ্বীপে যাওয়ার ঠিক ৯৬ ঘণ্টার মধ্যে অনলাইনে এই ট্রাভেলার ডিক্লারেশন ফর্মটি পূরণ করতে হবে। ফর্মটি পূরণ করার পর প্রাপ্ত কিউআর (QR) কোডটি ফোনে সংরক্ষণ করতে হবে বা প্রিন্ট করে নিতে হবে।

মালদ্বীপ ভিসা চেক অনলাইন বাংলাদেশ
অন অ্যারাইভাল ভিসার ক্ষেত্রে আগে থেকে ভিসা চেক করার কোনো সুযোগ বা প্রয়োজন নেই। তবে ভ্রমণের সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ অংশ হলো ইমুগা (IMUGA) ডিক্লারেশন চেক করা। মালদ্বীপ ইমিগ্রেশনের অফিশিয়াল ওয়েবসাইট (imuga.immigration.gov.mv) ব্যবহার করে আপনি এই কাজটি করতে পারবেন।
ইমুগা পোর্টালের মাধ্যমে আপনার তথ্য সঠিকভাবে জমা হয়েছে কি না তা চেক করা যায়। বাংলাদেশ থেকে ফ্লাইটে ওঠার আগে আপনার ইমুগা ফরমের কিউআর কোডটি অবশ্যই ডাউনলোড করে রাখবেন।
এয়ারপোর্টে বোর্ডিং পাস নেওয়ার সময় এয়ারলাইন্স কর্তৃপক্ষ এই ইমুগা কিউআর কোডটি পরীক্ষা করে দেখে। ইমুগা ফর্ম পূরণ সম্পূর্ণ ফ্রিতে করা যায়, তাই কোনো থার্ড পার্টি সাইটে টাকা দেবেন না।
আরো পড়ুন: নেপাল টুরিস্ট ভিসা আবেদন ও সকল আপডেট 2026
মালদ্বীপ টুরিস্ট ভিসা কবে চালু হবে
বাংলাদেশি পর্যটকদের জন্য মালদ্বীপের অন অ্যারাইভাল ভিসা সম্পূর্ণ চালু রয়েছে। করোনাকালীন সময়ের পর থেকে মালদ্বীপ তাদের পর্যটন খাত পুরোপুরি উন্মুক্ত করে দিয়েছে।
২০২৬ সালেও বাংলাদেশিরা কোনো বাধা ছাড়াই মালদ্বীপে ঘুরতে যেতে পারছেন। মাঝে মাঝে কূটনৈতিক কারণে কিছু নিয়মের সাময়িক পরিবর্তন হতে পারে। তবে সাধারণ পর্যটকদের জন্য ভিসা বন্ধ হওয়ার কোনো খবর নেই।
আপনি যেকোনো সময় প্রয়োজনীয় কাগজপত্র গুছিয়ে ভ্রমণের সিদ্ধান্ত নিতে পারেন। টিকিট বুক করার আগে মালদ্বীপ ইমিগ্রেশনের অফিশিয়াল ওয়েবসাইটে সাম্প্রতিক কোনো ট্রাভেল অ্যাডভাইজরি আছে কি না তা একবার দেখে নেওয়া বুদ্ধিমানের কাজ হবে।
মালদ্বীপ টুরিস্ট ভিসা খরচ
বাংলাদেশি নাগরিকদের জন্য মালদ্বীপের ৩০ দিনের অন অ্যারাইভাল টুরিস্ট ভিসা সম্পূর্ণ বিনামূল্যে দেওয়া হয়। অর্থাৎ, ভিসা পাওয়ার জন্য এয়ারপোর্টে কোনো অতিরিক্ত ফি বা চার্জ দিতে হয় না।
তবে ভিসা ফ্রি হলেও মালদ্বীপ ভ্রমণের কিছু আনুষঙ্গিক খরচ রয়েছে। নিচে আনুমানিক খরচের একটি ধারণা দেওয়া হলো:
-
বিমান ভাড়া: ঢাকা থেকে মালদ্বীপের সরাসরি বিমান ভাড়া সাধারণত রাউন্ড ট্রিপে (যাওয়া-আসা) ৪০,০০০ থেকে ৬০,০০০ টাকার মধ্যে হয়ে থাকে। কানেক্টিং ফ্লাইটের ভাড়া কিছুটা কম হতে পারে।
-
হোটেল বা রিসোর্ট: লোকাল আইল্যান্ডে (যেমন হুলহুমালের মতো জায়গা) বাজেট হোটেলে প্রতি রাতে ৪,০০০ থেকে ৮,০০০ টাকায় থাকা যায়। আর প্রাইভেট বিলাসবহুল রিসোর্টে থাকতে চাইলে প্রতি রাতে ২০,০০০ থেকে শুরু করে কয়েক লাখ টাকা পর্যন্ত খরচ হতে পারে।
-
খাবার ও যাতায়াত: মালদ্বীপে খাবার খরচ তুলনামূলক একটু বেশি। লোকাল আইল্যান্ডে তিনবেলা খাবারের জন্য প্রতিদিন জনপ্রতি ২,০০০ থেকে ৩,০০০ টাকা লাগতে পারে। এক আইল্যান্ড থেকে অন্য আইল্যান্ডে যাওয়ার জন্য স্পিডবোট বা ফেরি ব্যবহার করতে হবে, যার ভাড়াও দূরত্বের ওপর নির্ভর করে।
সব মিলিয়ে ৪ থেকে ৫ দিনের জন্য সাধারণ বাজেটে মালদ্বীপ ঘুরে আসতে জনপ্রতি ৭০,০০০ থেকে ৯০,০০০ টাকা খরচ হতে পারে।
আরো পড়ুন: ইন্ডিয়ান টুরিস্ট ভিসা খরচ এবং আবেদন করার নিয়ম 2026
মালদ্বীপ টুরিস্ট ভিসার মেয়াদ কতদিন
মালদ্বীপে পৌঁছানোর পর সাধারণ পর্যটকদের সর্বোচ্চ ৩০ দিনের জন্য অন অ্যারাইভাল টুরিস্ট ভিসা দেওয়া হয়। আপনি ইমিগ্রেশন কাউন্টারে আপনার রিটার্ন টিকিট এবং হোটেল বুকিং যত দিনের দেখাবেন, সাধারণত তত দিনের জন্যই প্রবেশাধিকার সিল দেওয়া হয়।
কোনো কারণে যদি আপনি মালদ্বীপে ৩০ দিনের বেশি থাকতে চান, তবে ভিসা বাড়ানোর আবেদন করতে হবে। মালদ্বীপে অবস্থানকালীন সময়েই দেশটির ডিপার্টমেন্ট অব ইমিগ্রেশনে গিয়ে ভিসা এক্সটেনশনের জন্য আবেদন করা সম্ভব।
পর্যটকরা তাদের ভিসা সর্বোচ্চ আরও ৬০ দিন বাড়িয়ে মোট ৯০ দিন পর্যন্ত মালদ্বীপে অবস্থান করতে পারেন। তবে কোনো অবস্থাতেই টুরিস্ট ভিসা নিয়ে মালদ্বীপে চাকরি বা ব্যবসা করা যাবে না, এটি সম্পূর্ণ অবৈধ এবং শাস্তিযোগ্য অপরাধ।
মালদ্বীপ টুরিস্ট ভিসা পেতে কতদিন লাগে
মালদ্বীপের অন অ্যারাইভাল ভিসা পেতে কোনো দিন বা সপ্তাহের পর সপ্তাহ অপেক্ষা করতে হয় না। আপনি বিমানে করে মালদ্বীপের ভেলানা আন্তর্জাতিক বিমানবন্দরে পৌঁছানোর পর সরাসরি ইমিগ্রেশন কাউন্টারে যাবেন।
সেখানে লাইনে দাঁড়িয়ে আপনার পাসপোর্ট ও অন্য কাগজপত্র জমা দিলে ইমিগ্রেশন কর্মকর্তা মাত্র কয়েক মিনিটের মধ্যেই আপনার পাসপোর্টে ভিসা স্ট্যাম্প করে দেবেন। পুরো প্রক্রিয়াটি শেষ হতে সাধারণত ১০ থেকে ২০ মিনিট সময় লাগে।
তবে বিমানবন্দরে বেশি ভিড় থাকলে ইমিগ্রেশনের লাইনে কিছুটা বেশি সময় লাগতে পারে। ভ্রমণের আগে ইমুগা ডিক্লারেশন ফরমটি সঠিকভাবে পূরণ করে রাখলে বিমানবন্দরে বাড়তি কোনো ঝামেলার মুখোমুখি হতে হয় না।
আরো পড়ুন: সুইজারল্যান্ড টুরিস্ট ভিসা আবেদন করার নিয়ম 2026
মালদ্বীপ টুরিস্ট ভিসা নিয়ে সাধারণ কিছু প্রশ্ন (FAQ)
বাংলাদেশিদের জন্য মালদ্বীপের ভিসা কি সম্পূর্ণ ফ্রি?
হ্যাঁ, বাংলাদেশি পর্যটকদের জন্য মালদ্বীপের ৩০ দিনের অন অ্যারাইভাল ভিসা একদম ফ্রি। ভিসা পাওয়ার জন্য আপনাকে বিমানবন্দর বা ইমিগ্রেশন কাউন্টারে কোনো টাকা বা ফি দিতে হবে না। তবে হোটেল বুকিং এবং রিটার্ন টিকিট থাকা আবশ্যক।
মালদ্বীপ যাওয়ার জন্য কত ডলার এন্ডোর্স করতে হয়?
মালদ্বীপে প্রবেশ করতে হলে আপনার কাছে পর্যাপ্ত ভ্রমণের খরচ থাকতে হবে। সাধারণত প্রতিদিনের খরচের জন্য অন্তত ৫০ থেকে ১০০ ইউএস ডলার নগদ অথবা ইন্টারন্যাশনাল কার্ডে সমপরিমাণ ডলার এন্ডোর্সমেন্ট দেখাতে হয়।
ইমুগা (IMUGA) ফর্মটি কখন পূরণ করতে হবে?
মালদ্বীপে পৌঁছানোর ঠিক ৯৬ ঘণ্টার মধ্যে অনলাইনে ইমুগা ট্রাভেলার ডিক্লারেশন ফর্ম পূরণ করতে হবে। একইভাবে মালদ্বীপ থেকে বাংলাদেশে ফিরে আসার আগের ৯৬ ঘণ্টার মধ্যেও এই ফর্মটি আবার পূরণ করা বাধ্যতামূলক। এটি সম্পূর্ণ ফ্রিতে করা যায়।
টুরিস্ট ভিসা নিয়ে কি মালদ্বীপে চাকরি করা যাবে?
না, মালদ্বীপের টুরিস্ট ভিসা নিয়ে সেখানে কোনো ধরণের চাকরি বা ব্যবসা করা সম্পূর্ণ অবৈধ। টুরিস্ট ভিসা শুধুমাত্র ভ্রমণের উদ্দেশ্যে দেওয়া হয়। কাজের উদ্দেশ্যে যেতে চাইলে আপনাকে বৈধ ওয়ার্ক পারমিট বা কাজের ভিসা নিয়ে যেতে হবে।
মালদ্বীপ প্রতিটি ভ্রমণপিপাসু মানুষের জন্য একটি স্বপ্নের গন্তব্য। মাত্র কয়েক ঘণ্টার আকাশপথ পাড়ি দিয়েই এই নয়নাভিরাম দ্বীপরাষ্ট্রে পৌঁছানো যায়। বাংলাদেশি পর্যটকদের জন্য মালদ্বীপ টুরিস্ট ভিসা পাওয়ার সহজ নিয়ম এই ভ্রমণকে আরও আনন্দদায়ক করে তোলে।
শুধু আপনার পাসপোর্ট, রিটার্ন টিকিট, হোটেল বুকিং এবং ইমুগা ফর্মের মতো মৌলিক বিষয়গুলো আগে থেকেই প্রস্তুত রাখতে হবে। সঠিক তথ্য ও সঠিক পরিকল্পনা থাকলে আপনার মালদ্বীপ যাত্রা অনেক বেশি নিরাপদ এবং স্মৃতিময় হবে। আজই আপনার ভ্রমণের দিনক্ষণ নির্ধারণ করুন আর হারিয়ে যান নীল জলের রাজ্যে। শুভ ভ্রমণ!
আরো পড়ুন: থাইল্যান্ড টুরিস্ট ভিসা আবেদন সম্পর্কে সকল তথ্য 2026