হিমালয়ের দেশ নেপাল ভ্রমণের জন্য বাংলাদেশি পর্যটকদের কাছে সবসময়ই জনপ্রিয়। নেপাল সরকার এখন স্টিকার ভিসার পরিবর্তে ইলেকট্রনিক ট্রাভেল অথরাইজেশন বা eTA সিস্টেম চালু করেছে। বাংলাদেশিদের জন্য এই দেশের ভিসা প্রসেসিং বেশ সহজ। আজকের আর্টিকেলে আমরা নেপাল টুরিস্ট ভিসা পাওয়ার সহজ উপায়, খরচ এবং নতুন আপডেট নিয়ে বিস্তারিত আলোচনা করব।
ভ্রমণের প্রস্তুতি নেওয়ার আগে ভিসার সঠিক নিয়ম জানা থাকলে কোনো ঝামেলায় পড়তে হয় না। নিচে আবেদনের পুরো প্রক্রিয়া এবং প্রয়োজনীয় তথ্যের তালিকা দেওয়া হলো।
নেপাল টুরিস্ট ভিসা আবেদন
বাংলাদেশি নাগরিকদের জন্য নেপাল টুরিস্ট ভিসা আবেদন করার দুটি প্রধান মাধ্যম রয়েছে। প্রথমটি হলো ঢাকার নেপাল এম্বাসি থেকে eTA বা ভিসা সংগ্রহ করা। দ্বিতীয়টি হলো নেপালের এয়ারপোর্ট বা ল্যান্ড বর্ডারে পৌঁছে অন অ্যারাইভাল ভিসা নেওয়া।
ভ্রমণের আগে অনলাইনের মাধ্যমে প্রি-রেজিস্ট্রেশন ফরম পূরণ করতে হয়। নেপাল ইমিগ্রেশনের অফিশিয়াল ওয়েবসাইটে (nepaliport.immigration.gov.np) গিয়ে এই ফরম পূরণ করা যায়। অনলাইনে ফরম পূরণ করার পর একটি বারকোডসহ রিসিট পাওয়া যায়। এই রিসিটটি প্রিন্ট করে সাথে রাখতে হবে।
আপনি চাইলে এই বারকোড রিসিট নিয়ে সরাসরি ঢাকা এম্বাসিতে জমা দিতে পারেন। আবার এটি সাথে নিয়ে নেপালের ত্রিভুবন আন্তর্জাতিক বিমানবন্দরে পৌঁছেও অন অ্যারাইভাল ভিসা নিতে পারেন।
নেপাল টুরিস্ট ভিসা করতে কি কি লাগে?
ভিসা আবেদনের জন্য কিছু নির্দিষ্ট কাগজপত্রের প্রয়োজন হয়। কাগজপত্র ঠিক থাকলে খুব দ্রুত ভিসা পাওয়া সম্ভব। নেপাল টুরিস্ট ভিসা করতে নিচে দেওয়া ডকুমেন্টসগুলো গুছিয়ে রাখুন:
-
পাসপোর্ট: মূল পাসপোর্টের মেয়াদ অন্তত ৬ মাস থাকতে হবে। পাসপোর্টে অন্তত দুটি ফাঁকা পাতা থাকা জরুরি।
-
ভিসা ফরম: অনলাইনে পূরণ করা প্রি-অ্যারাইভাল ভিসা ফরমের প্রিন্ট কপি।
-
ছবি: সাম্প্রতিক সময়ে তোলা পাসপোর্ট সাইজের ২ কপি ল্যাব প্রিন্ট ছবি। ব্যাকগ্রাউন্ড অবশ্যই সাদা হতে হবে।
-
টিকিট: যাওয়া এবং আসার কনফার্ম এয়ার টিকিট বুকিংয়ের কপি।
-
হোটেল বুকিং: নেপালে যে হোটেলে থাকবেন, তার কনফার্ম বুকিংয়ের কাগজ।
-
পরিচয়পত্র: জাতীয় পরিচয়পত্র (NID) অথবা জন্ম সনদের স্পষ্ট ফটোকপি।
-
চাকরিজীবী/শিক্ষার্থী: চাকরিজীবীদের জন্য নো অবজেকশন সার্টিফিকেট (NOC) বা অফিস আইডি কার্ড। শিক্ষার্থীদের জন্য স্টুডেন্ট আইডি কার্ডের কপি প্রয়োজন হবে。
নেপাল ভিসা চেক অনলাইন বাংলাদেশ
অনলাইনে আবেদন করার পর আপনার ভিসার বর্তমান অবস্থা জানা খুব সহজ। আপনি বাংলাদেশ থেকেই ঘরে বসে নেপাল ভিসা চেক করতে পারবেন।
eTA ও ভিসা ট্র্যাকিং পদ্ধতি
অনলাইনে ভিসা চেক করার জন্য নেপাল ইমিগ্রেশনের অফিশিয়াল পোর্টালে যেতে হবে। সেখানে “Visa Application Track” বা “Check Visa” অপশন রয়েছে।
ওই অপশনে আপনার অ্যাপ্লিকেশন আইডি এবং পাসপোর্ট নম্বর দিতে হবে। সঠিক তথ্য দিয়ে সাবমিট করলেই আপনার ভিসার বর্তমান স্ট্যাটাস স্ক্রিনে দেখা যাবে। ভিসা অ্যাপ্রুভ হলে eTA ডাউনলোডের অপশন পাওয়া যায়। সেটি প্রিন্ট করে পাসপোর্টের সাথে রেখে দিন।
নেপাল টুরিস্ট ভিসা কবে চালু হবে
অনেকেই জানতে চান নেপাল টুরিস্ট ভিসা কবে চালু হবে বা বর্তমানে বন্ধ আছে কি না। মূলত নেপালের টুরিস্ট ভিসা কখনোই বন্ধ হয়নি।
বাংলাদেশি পর্যটকদের জন্য এই ভিসা বর্তমানে সম্পূর্ণ চালু আছে। আপনি যেকোনো সময় ট্যুরের জন্য আবেদন করতে পারবেন। তবে অফ-সিজন বা যেকোনো উৎসবের ছুটির দিনগুলোতে এম্বাসির কার্যক্রম বন্ধ থাকে।
তাই ভ্রমণের তারিখ ঠিক করার আগে এম্বাসির ছুটির তালিকা দেখে নেওয়া ভালো। বর্তমানে কোনো প্রকার ভ্রমণ নিষেধাজ্ঞা নেই। আপনি নিশ্চিন্তে আপনার নেপাল ভ্রমণের পরিকল্পনা করতে পারেন।
নেপাল টুরিস্ট ভিসা খরচ
বাংলাদেশি নাগরিকদের জন্য নেপাল ভ্রমণে খরচের ক্ষেত্রে বিশেষ একটি সুবিধা রয়েছে। সার্ক (SAARC) ভুক্ত দেশের নাগরিক হওয়ায় বাংলাদেশিরা বছরে একবার বিনামূল্যে নেপাল যাওয়ার সুযোগ পান।
ভিসা ফি এর বিবরণী
ক্যালেন্ডার ইয়ার বা বছরের প্রথম ভ্রমণে ৩০ দিনের জন্য কোনো ভিসা ফি লাগে না। একে গ্র্যাটিস বা সৌজন্যমূলক ভিসা বলা হয়। কিন্তু একই বছরে আপনি দ্বিতীয়বার নেপাল গেলে নির্দিষ্ট ফি দিতে হবে। আবার প্রথম ভ্রমণে ৩০ দিনের বেশি থাকতে চাইলেও ফি প্রযোজ্য হবে। ২০২৬ সালের আপডেট অনুযায়ী নেপাল এম্বাসির বর্তমান সংশোধিত ফি নিচে দেওয়া হলো:
-
১৫ দিনের মাল্টিপল এন্ট্রি ভিসা: ৩৬৩০ টাকা।
-
৩০ দিনের মাল্টিপল এন্ট্রি ভিসা: ৬০৫০ টাকা।
-
৯০ দিনের মাল্টিপল এন্ট্রি ভিসা: ১৫১২৫ টাকা।
এম্বাসির মাধ্যমে আবেদন করলে প্রসেসিং ফি বাবদ ১০০০ টাকা লাগতে পারে। অন অ্যারাইভাল ভিসার ক্ষেত্রে ডলারের মাধ্যমে এয়ারপোর্টে এই ফি পরিশোধ করা যায়।
নেপাল টুরিস্ট ভিসার মেয়াদ
ভ্রমণের পরিকল্পনার ওপর ভিত্তি করে আপনি ভিন্ন মেয়াদের নেপাল টুরিস্ট ভিসা বেছে নিতে পারেন। নেপাল সরকার সাধারণত তিন ধরনের মেয়াদের ভিসা ইস্যু করে থাকে।
ভিসার ক্যাটাগরি ও সময়সীমা
আপনার ভ্রমণের সময় অনুযায়ী ১৫ দিন, ৩০ দিন অথবা ৯০ দিনের ভিসা নিতে পারবেন। এই ভিসাগুলো সাধারণত মাল্টিপল এন্ট্রি হয়ে থাকে। ভিসার মেয়াদ থাকা অবস্থায় আপনি একাধিকবার নেপালে যাতায়াত করতে পারবেন।
নেপালে পৌঁছানোর পর যদি আপনার মনে হয় আরও কিছুদিন থাকা প্রয়োজন, তাহলে ভিসা বাড়ানো সম্ভব। মেয়াদকোত্তীর্ণ হওয়ার আগেই কাঠমান্ডুর ইমিগ্রেশন অফিসে গিয়ে ভিসার মেয়াদ বাড়ানোর আবেদন করতে হবে।
নেপাল টুরিস্ট ভিসা পেতে কতদিন লাগে
বাংলাদেশ থেকে নেপালের ভিসা পাওয়ার প্রক্রিয়াটি খুবই দ্রুত সম্পন্ন হয়। অন্যান্য দেশের মতো এখানে দীর্ঘ সময় অপেক্ষা করতে হয় না।
সরাসরি ত্রিভুবন এয়ারপোর্টে অন অ্যারাইভাল ভিসার জন্য লাইনে দাঁড়ালে সেদিনই ভিসা সিল পেয়ে যাবেন। এয়ারপোর্টের ভিড়ের ওপর ভিত্তি করে ৩০ মিনিট থেকে ১ ঘণ্টা সময় লাগতে পারে।
অন্যদিকে আপনি ঢাকার নেপাল এম্বাসির মাধ্যমে eTA নিলে সাধারণত ২ কর্মদিবস সময় লাগে। রবিবার থেকে বৃহস্পতিবার সকাল ৯:৩০ থেকে ১২:৩০ এর মধ্যে এম্বাসিতে ফাইল জমা নেওয়া হয়। সাধারণত পরবর্তী কর্মদিবসের বিকেলেই পাসপোর্ট ও eTA ডেলিভারি দেওয়া হয়।
নেপাল টুরিস্ট ভিসা সংক্রান্ত সাধারণ জিজ্ঞাসা (FAQ)
বাংলাদেশীদের জন্য নেপাল ভিসা কি ফ্রি?
হ্যাঁ, বাংলাদেশীদের জন্য বছরের প্রথম নেপাল ভ্রমণ সম্পূর্ণ ফ্রি। ক্যালেন্ডার ইয়ারের প্রথম ভ্রমণে ৩০ দিনের জন্য কোনো ভিসা ফি লাগে না। তবে একই বছরে দ্বিতীয়বার ভ্রমণ করলে নির্দিষ্ট ফি দিতে হবে।
নেপাল যেতে কি পাসপোর্ট লাগবে?
হ্যাঁ, নেপাল ভ্রমণের জন্য অবশ্যই মূল পাসপোর্ট লাগবে। পাসপোর্টের মেয়াদ ভ্রমণের দিন থেকে কমপক্ষে ৬ মাস থাকতে হবে। পাসপোর্টে অন্তত দুটি খালি পৃষ্ঠা থাকা বাধ্যতামূলক।
নেপাল অন অ্যারাইভাল ভিসা পেতে কি কি লাগে?
অন অ্যারাইভাল ভিসার জন্য অনলাইন প্রি-অ্যারাইভাল ফরমের প্রিন্ট কপি লাগবে। সাথে ২ কপি সাদা ব্যাকগ্রাউন্ডের ছবি এবং পাসপোর্টের কপি রাখুন। এছাড়া কনফার্ম হোটেল বুকিং এবং রিটার্ন এয়ার টিকিট দেখাতে হবে।
ঢাকা নেপাল এম্বাসি কোথায় অবস্থিত?
ঢাকার নেপাল এম্বাসি বারিধারা কূটনৈতিক এলাকায় অবস্থিত। এর সঠিক ঠিকানা: রোড নম্বর ২, ব্লক-নেক (NEK), বারিধারা, ঢাকা-১২১২। এখানে রবিবার থেকে বৃহস্পতিবার ফাইল জমা নেওয়া হয়।
নেপাল ভ্রমণের জন্য বর্তমান নিয়মগুলো বেশ সহজ ও আধুনিক। ঘরে বসে অনলাইনে ফরম পূরণ করে খুব সহজেই নেপাল টুরিস্ট ভিসা প্রসেস করা যায়। সঠিক কাগজপত্র সাথে রাখলে এয়ারপোর্টে কোনো ঝামেলার মুখোমুখি হতে হয় না। প্রথম ভ্রমণের সৌজন্যমূলক ভিসা সুবিধা আপনার খরচ অনেকখানি কমিয়ে দেবে।
আপনার পাসপোর্ট তৈরি রাখুন এবং প্রয়োজনীয় কাগজপত্রের হার্ডকপি সাথে নিয়ে নিন। সুন্দর এবং নিরাপদ ভ্রমণের জন্য সব নিয়ম মেনে চলাই বুদ্ধিমানের কাজ। ২০২৬ সালের এই নতুন আপডেটগুলো অনুসরণ করে আজই আপনার নেপাল ট্যুরের বুকিং সম্পন্ন করুন। শুভ ভ্রমণ!